মিয়ানমারকে চাপ দিন : ওআইসিকে প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার।।
রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দুর্ভোগ অবসানে মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে মুসলিম দেশগুলোর সক্রিয়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা তাদের উপর চালানো নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে আসছেন। একে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে দেখছে জাতিসংঘ।
শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহম্মদ (সঃ) নিপীড়িত মানবতার পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কাজেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি যখন জাতিগত নির্মূলের মুখোমুখি, ওআইসি তখন নিশ্চুপ থাকতে পারে না। নিপীড়িত মানবতার জন্য আমরা আমাদের চিত্ত ও সীমান্ত দুই-ই উন্মুক্ত করে দিয়েছি। মিয়ানমারের প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের ব্যথায় ব্যথিত।

১৯৭৫ সালে ১৫অগাস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর নিজের উদ্বাস্তু হয়ে বিদেশের মাটিতে কাটানোর অভিজ্ঞতাও ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সামনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের ৪০ জন মন্ত্রী ও সহকারী মন্ত্রীসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ইতিহাসের এক ‘বিশেষ সন্ধিক্ষণে’ ঢাকায় ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি যখন প্রযুক্তি প্রবাহ ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং যুব সমাজের কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে অসমতা, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অবিচার এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব।
“এসবের সমন্বিত প্রভাবে আমাদের ইসলামী চিন্তা-চেতনার মৌলিক ভিত্তি আজ হুমকির সম্মুখীন। এমন অবস্থা আগে কখনও আমরা প্রত্যক্ষ করিনি।”

মুসলিম বিশ্বে সংঘাত ও চরমপন্থার কথা তুলে ধরে চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনার কথাও বলেন শেখ হাসিনা।

“মুসলিম বিশ্ব আগে কখনও এত বেশি পরিমাণ সংঘাত, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, বিভাজন ও অস্থিরতার মুখোমুখি হয়নি। লক্ষ্য করা যায়নি এত ব্যাপক হারে বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীর দেশান্তর। আজকে মুসলমান পরিচয়কে ভুলভাবে সহিংসতা ও চরমপন্থার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে।”

এই অবস্থা চলতে পারে না মন্তব্য করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সময় এসেছে চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার।

‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- বঙ্গবন্ধুর সময় নেওয়া বাংলাদেশের এ পররাষ্ট্র নীতি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা মনে করি আজ ইসলামী বিশ্বে যেসব মতপার্থক্য ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা খোলামন নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব।

“রক্তপাত শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয় বরং তা আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্ম দেয়।”

তিনি বলেন, “আমাদের ইসলামী বিশ্বের রূপকল্প এমন হতে হবে যাতে আমরা আমাদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারি। আমাদের নিজেরাই সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সমাধান করতে পারি।

“দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ফলাফল-কেন্দ্রিক নতুন কৌশল-সম্বলিত একটি রূপান্তরিত ওআইসি।”

ফিলিস্তিন সমস্যারও সমাধান হওয়া উচিত মন্তব্য করে এ বিষয়ে ওআইসির ভূমিকা প্রত্যাশা করেন শেখ হাসিনা।

মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতর লক্ষ্যে কয়েকটি নিজের বেশ কয়েকটি চিন্তাভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা বর্জন করতে হবে এবং ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা বা সমাজে বিভাজন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
“আমাদের নিন্দুকদের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিয়ে নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। ওআইসিতে আমাদের বিরোধ মীমাংসার প্রক্রিয়াসমূহকে শক্তিশালী করতে হবে এবং আমাদের নিজস্ব শক্তি ও সম্পদসমূহের আরও উৎকর্ষ সাধন করতে হবে।”

তিনি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ বন্ধ, ইসলামী উম্মাহর মধ্যে বিভেদ বন্ধ এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পথে যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করার প্রস্তাব তুলে ধরেন।

পৃথিবীর এক-পঞ্চমাংশ জনশক্তি, এক-তৃতীয়াংশের বেশি কৌশলগত সম্পদ এবং সম্ভাবনাময় কয়েকটি উদীয়মান শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ থাকার পরও মুসলিম বিশ্বের পিছিয়ে পড়া বা অমর্যাদাকর অবস্থায় থাকার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে সাফল্য, ঐতিহ্যগত ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের শক্তি আমাদের নারী ও যুবসমাজ এবং জনসংখ্যার বর্তমান আদল।

“আমাদের যুবশক্তি ও প্রযুক্তিতে যথাযথ বিনিয়োগ করে তাদের উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এই যুবসম্পদের উপর ভিত্তি করে আমরা শান্তি ও উন্নয়নের একটি নিয়মনিষ্ঠ কাঠামো তৈরি করতে পারি। এটা বৃহত্তর ওআইসি’র আঙ্গিকেও হতে পারে।”

দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর, জরুরি মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইসলামী সম্মেলন সংস্থার বলিষ্ঠ কর্মসূচিসহ একটি দ্রুত কার্যকর উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা আবশ্যক বলেও মনে করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ওআইসির মহাসচিব ইউসুফ এ ওথাইমিন, আইভরি কোস্টের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারসেল আমোন তানোহ, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড।

এছাড়া তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ওআইসির বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *