বজ্রপাতে বাড়ছে মৃত্যুর হার : ৫ দিনে নিহত ৬৭

স্টাফ রিপোর্টার।।
বজ্রপাতে গতকাল শুক্রবারও প্রাণহানি ঘটেছে। গতকালই ১২ জেলায় বজ্রপাতে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এই ১৪ জনসহ গত পাঁচ দিনে বজ্রপাতে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বড় অংশই মাঠে খেটে খাওয়া সাধারণ চাষি-গেরস্ত। এর আগে এপ্রিলের মৃত্যুতালিকার খাতা বন্ধ হয় প্রায় ৭৬ জনের তালিকা দিয়ে; গত বছরের তুলনায় এটা দ্বিগুণের বেশি। ২০১৭ সালের এপ্রিলে বাজ পড়ে মারা যায় ৩২ জন, তার আগের বছরের এপ্রিলে ৪৩ জন। মে-জুন-জুলাই পর্যন্ত মৃত্যুর এই কাফেলা চলবে। মৌসুমি বায়ু বিদায়ের বা বর্ষা বিদায়ের মাসগুলোতেও (আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) বজ্রপাতে মানুষ মারা যায়। তবে মৌসুমি বায়ু আগমনের মাসগুলোর (এপ্রিল-মে-জুন) থেকে কম।

বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ কী, সেটি নিয়ে বাংলাদেশে বিস্তারিত কোনো গবেষণা নেই। তবে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন গবেষক এর নানা কারণ তুলে ধরেন। কোনো কোনো গবেষক বলেন, তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। পৃথিবীর যে কয়েকটি অঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ, তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। হাওরাঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে বজ্রপাতে।
নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকার কারণে বজ্রপাতের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে কি না, এটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে বজ্রপাতের কারণে মানুষের হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে অন্তত সাড়ে তিন শ মানুষ মারা যাওয়ার পর বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার। এরপর বজ্রপাত রোধে নেওয়া হয় বিশেষ পরিকল্পনা এবং শুরু হয় সতর্কীকরণ কর্মসূচি। কিন্তু তাতে ভাটা পড়েনি মৃত্যুর মিছিলে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ রুবাইয়াত কবির জানিয়েছিলেন, দেশের কিছু জায়গা বজ্রপাতপ্রবণ। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর পশ্চিমাঞ্চল অন্যতম। গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যেসব এলাকায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, সেসব এলাকায় যে মেঘের সৃষ্টি হয়, সেখান থেকেই বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকে। ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হাওর এলাকায় এককভাবে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। এ ছাড়া যশোর-সাতক্ষীরা অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট এলাকাতেও বজ্রপাতে হতাহতের একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
ইদানীং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বজ্রপাতেই বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এই প্রবণতা ভারত ও নেপালেও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। দুর্যোগ ও আবহাওয়া পণ্ডিতদের অনেকেই মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাত হচ্ছে, এটা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে তাপমাত্রার সঙ্গে বজ্রঝড়ের সম্পর্ক নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে বিষয়টিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগের তালিকাভুক্ত করার পর সারা দেশে ব্যাপক হারে তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশে ১০ লাখ তালগাছ রোপণ করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ জানিয়েছেন, প্রায় ২৮ লাখ বীজ সংগৃহীত হয়েছে এবং তা লাগানো হচ্ছে। তবে যেহেতু তালগাছ বড় হতে কিছুটা সময় লাগবে, তাই পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর কিছু ব্যবস্থাও নিতে হবে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে অনুসরণ করে বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এ দুটি দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত টাওয়ারের নকশা চূড়ান্ত করেছেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ির ছাদে বজ্র নিরাপত্তা টাওয়ার এবং হাওর এলাকায় একতলা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তবে তালগাছ রাস্তার পাশে না লাগিয়ে জমির আলে লাগানো এবং অন্য প্রজাতির দ্রুত বর্ধনশীল গাছ, যেমন সুপারি, বাবলা ইত্যাদি গাছের কথা ভাবা যেতে পারে।আবহাওয়া দপ্তর বজ্রপাতের আগাম সংকেত জানতে ‘লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর’ বসানোর কাজে হাত দিয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া, নওগাঁর বদলগাছি, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনার কয়রা এবং পটুয়াখালীতে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হবে এই সেন্সর। আবহাওয়া দপ্তর আশা করছে, আটটি সেন্সরে পুরো দেশের চিত্র উঠে আসবে। একেকটি সেন্সরের সীমা হচ্ছে ২৫০ কিলোমিটার। প্রতিটি সেন্সর থেকে এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত মনিটরিং করা যাবে। এক মৌসুমে (এপ্রিল থেকে জুন) দেশে কতবার বিদ্যুৎ চমকায় ও বজ্রপাত হয়, সেটিও সংরক্ষণ করা হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হবে।

আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, ‘বাংলাদেশে ১৩টি নদীবন্দরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতের সংকেত ও সংখ্যা নিরূপণের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৬২ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮টি ডিটেকটিভ সেন্সরের যন্ত্রপাতি কেনায় খরচ হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালু হলে ঝড়-বৃষ্টির সময় কোন জেলায় বজ্রপাত হতে পারে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারবে আবহাওয়া দপ্তর। এমনকি ১০ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা আগে বজ্রপাতের সংকেত দেওয়া যাবে।  এতে ওই এলাকার মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার সময় পাবে। ফলে বজ্রপাতে প্রাণহানি কমে আসবে দেশে। এই কাজটি কমিউনিটি রেডিও নেটওয়ার্কে যুক্ত করা প্রয়োজন। আর আবহাওয়া দপ্তরের আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে তাদের তথ্য আদান-প্রদানের সনাতন ব্যবস্থা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *