সালমান শাহ হত্যামামলা : চিকিৎসক-ডোমকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি আদালতের

স্টাফ রিপোর্টার
চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র হত্যামামলায় যে চিকিৎসক সালমান শাহকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছিলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সালমান শাহ’র মৃত্যুর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ডোমকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০ আগস্ট নতুন করে দিন ধার্য করেছেন আদালত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই মামলার তদন্তের স্বার্থেই সালমান শাহকে যে চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন করি। সালমান শাহ’র মৃত্যুর পর তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে নেওয়া হয়। তখন যে ডোম ছিলেন, তদন্তের সার্থে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চাই। আদালত দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন। তবে কোন চিকিৎসক সালমান শাহকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছিলেন, সেই চিকিৎসকের নাম এখনো জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম।
সালমান শাহ’র আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, সালমান শাহ যেদিন মারা যান, সেদিন রুবি নামের এক নারী ইস্কাটনের ক্লাব ও মেডিকেল সেন্টারের একজন চিকিৎসককে সালমান শাহ’র বাসায় নিয়ে আসেন। ওই চিকিৎসক দেখে বলেন, সালমান শাহ মারা গেছেন। সেখানে ওই চিকিৎসক সালমান শাহ মারা গেছেন জানিয়ে সনদও দেন। ফারুক আহমেদ জানান, রুবি এই মামলার একজন আসামি।
এদিকে চিত্রনায়ক সালমান শাহ মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে আদালত ডোম ও চিকিৎসককে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়ায় হতবাগ ডোম রমেশ চন্দ্র ওরফে সিকান্দার আলী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে বিষয়টি জানালে হতবাক হয়ে তিনি বলেন, বলেন কি, আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? আমি কি বলবো, বললে বলবে ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার।
তিনি আরও বলেন, এত্তো বছর আগের ঘটনা, এখন তো কিছুই মনে নাই। জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ কথা বলা ছাড়া কিই বা বলতে পারব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) বিশেষ করে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অতি পরিচিত মুখ মধ্যবয়সি সিকান্দার আলী। বাবার হাত ধরে কিশোর বয়সে এ পেশায় এসেছেন। মরচুয়েরি এসিস্ট্যান্ট হিসেবে জীবনে হাজার হাজার লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন। ময়নাতদন্ত করতে করতে এতটাই অভিজ্ঞ হয়েছেন যে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অনেক চিকিৎসক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরিতে তার পরামর্শ নেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ যখন মারা যান তখন সিকান্দার আলী একেবারেই তরুণ। তখন তার নাম ছিল রমেশ চন্দ্র। পরবর্তীতে ধমান্তরিত হয়ে নাম পরিবর্তন করেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে সিকান্দার আলী বলেন, যতদূর মনে পড়ে তৎকালিন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ডা. তেজেন দাস ও ডা. বারি নামে দু’জন চিকিৎসক সালমান শাহ’র ময়নাতদন্ত করেছিলেন। ওই সময় তিনিও ময়নাতদন্ত কাজে চিকিৎসকদের সহায়তা করেছিলেন। তবে ২২ বছর আগে করা সেই ময়নাতদন্ত সম্পর্কে এখন আর তেমন কিছুই মনে নেই। তিনি বলেন, ‘এতো বছর আগের কথা কী কারও কিছু মনে থাকে!’
সিকান্দার আলী জানান, তেজেন দাস ও বারি নামের ওই দুই ফরেনসিক মেডিসিনের চিকিৎসক বহু বছর আগেই চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বলে জানেন। তারা এখন কোথায় আছেন জানেন না। পাশাপাশি সালমান শাহ নায়ক বলেই এতো কিছু হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
‘হত্যা’ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ানো প্রসঙ্গে কথা বলেন নীলা চৌধুরী। তিনি বলেন: আমার শরীরটা খুব খারাপ। সকাল থেকে আদালতের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। সকাল ১০ থেকে ১টা পর্যন্ত আমি ছিলাম। এখনো সালমানের ভক্ত অনুরাগীরা ব্যানার নিয়ে আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সকালে দাঁড়ানোর পর আমাদের কাছে পুলিশ আসলো। এসে তারা আমাদের কাছে সময় চেয়েছে। বললো, ইনজেকশন দিয়েছিলো যে ডাক্তার এবং মর্গের ডোমদের পাওয়া যায়নি। পুলিশ তাদের সন্দেহ করেছিলো। তাদের দাবি, শিগগির ডাক্তার ও ডোমকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর এজন্যই আমাদের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় চেয়েছে পুলিশ। আমি ভেবে দেখলাম, পুলিশের কথা ঠিক এবং সালমানের হত্যা মামলায় এমন ইনভেস্টিগেশন গুরুত্বপূর্ণ। আর এজন্য আমরাও সময় বাড়িয়ে দিয়েছি।
নীলা চৌধুরী বলেন, আদালত আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করেছেন। খুবই সুন্দর ভাবে আমাদের বলেছেন, তারাও সুষ্ঠু বিচার চান বলে আমাকে জানিয়েছেন। তাই আগামি ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। আমিও তাদেরকে এই লম্বা সময় দিয়েছি। যেনো সব ইনভেস্টিগেশন করে পরবর্তী তারিখে আর কিছু না বলতে পারেন বা তারিখ পেছাতে পারেন। এছাড়া অনেক দূর-দূরান্ত থেকে সালমানের ভক্ত অনুরাগীরা ঢাকায় আসেন, আমি নিজেও অসুস্থ। আর দৌড়াদৌড়ি করতে শরীরে সায় দেয় না। গত ২২ বছর ধরেতো করছিই। তবে এবার আশা করছি, আমি আমার ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার পাবো।
আগামি চারমাসে সালমান হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবীর আন্দোলন আরো ছড়িয়ে যাবে বলেও বিশ্বাস করেন নীলা চৌধুরী। এখনো ষড়যন্ত্রকারী একটি মহল সালমান হত্যার বিচারকে বানচালের চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
সালমানের মা বলেন, আদালত আরো চার মাসের সময় চাইলো তদন্তের জন্য। আমি মনে করি এই চার মাসে সালমান শাহ’র হত্যার বিষয়টি খোলাসা হবে। সালমান হত্যা বিচারের দাবি আরো ত্বরান্বিত হবে। যদিও আজকেও শুনেছি, যেসব ভক্ত অনুরাগীরা সালমানের বিচার চাইতে ঢাকায় এসেছে তাদের হুমকি-ধামকি দিয়েছে কেউ। কারা এটা করছে, এটা আমাকে কেউ বলছে না। আমার পেছনেওতো লোক আছে, ফলো করে। তবে এসব করে কিছুই হবে না। সালমান হত্যার বিচার হবেই ইনশাল্লাহ।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, চিত্রনায়ক সালমান শাহ স্ত্রীকে নিয়ে ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। ঘটনার দিন প্রথমে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্ত্রী সামিরা হক পুলিশকে জানান, সকালবেলা ড্রেসিংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমানকে তারা শনাক্ত করে দেহটি নামিয়ে আনেন। বাংলা সিনেমার সে সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল-২০ বছরেও পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি এ প্রশ্নের। চার দফা তদন্ত এ প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর দিতে পারেনি।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। ওই সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- অভিযোগ করে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যাকা-ের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ’র মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। এরপর প্রায় ১২ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীর ছেলের মৃত্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং ওই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বলে আবেদন করেন।
২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের নারাজির আবেদন দাখিল করেন। নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। আদালত নারাজি আবেদনটি মঞ্জুর করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে তদন্তভার প্রদান করেন। মামলাটিতে র‌্যাবকে তদন্ত দেয়ার আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন মামলা করেন। অবশেষে ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর পিবিআইকে পুনঃতদন্তের জন্য নির্দেশ দেন আদালত।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *