রাজধানীতে দুই নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যু : সাভারের হলের বারান্দা থেকে পড়ে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র নিহত

স্টাফ রিপোর্টার
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জাপান গার্ডেন সিটির চারতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে পড়ে হাছিনা নকিব (৫৬) নামের এক নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে চকবাজারের ঢাকেশ্বরী রোডের একটি বাসায় পানির ট্যাংকিতে পড়ে নুরুন্নাহার কাজল (৫৮) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সাভারের সোমবার রাতে সাভারের খাগান এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের আবাসিক হলের বারান্দা থেকে পড়ে সাইফুল্লাহ তালুকদার মহসিন (২২) নামে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির এক ছাত্র নিহত হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য নিহতদের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সন্তান-সংসার নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছিলেন হাছিনা নকিব। তার প্রতিবেশীদের কাছেও হতাশার কথা প্রকাশ করতেন। বাসা থেকেও পালিয়েছিলেন একবার। সোমবার দিবাগত রাত তিনটায় পালাতে গিয়েই চারতলা থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। নিহত হাসিনার স্বামী হারুন নকিব অবসরপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। জাপান গার্ডেন সিটির ১৬ তলা একটি ভবনের চারতলায় স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন হাছিনা নকিব।
জাপান গার্ডেন সিটি ফ্ল্যাট মালিক কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও মারা যাওয়া নারীর প্রতিবেশী মুফদি আহমেদ বলেন, ২০ নম্বর ভবনের ৪০৪ নম্বর ফ্ল্যাটটি হারুন নকিবের। তাঁ স্ত্রী হাছিনা নকিব মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। আগেও তার চিকিৎসা করানো হয়েছে। আবার হাসপাতালে নেওয়ার কথা শুনে রান্নাঘর সংলগ্ন বারান্দার গ্রিলের কাটা অংশ দিয়ে তিনি পালাতে চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
মুফদি আহমেদ বলেন, সোমবারও তাকে দেখেছি। তিনি প্রায়ই ছেলেদের নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতেন। একবার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ ছিলেন বলেও শুনেছি।
হাছিনা নকিবের পরিবার, পুলিশ ও প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গেছে, হারুন নকিব ও হাছিনা নকিব দম্পতির সাদ, তৌফিক, শাওন ও তাহসান নামে চার ছেলে রয়েছে। এর মধ্যে বড় দুই ছেলে আলাদা বসবাস করেন। বড় ছেলে সাদ ব্যবসা করেন। তিনি জাপান গার্ডেন সিটির অন্য একটি ভবনে ভাড়া থাকেন। দ্বিতীয় ছেলে তৌফিক উবার চালক। স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তিনিও আলাদা থাকেন। অবসরের পর হারুন নকিব স্ত্রীর নামে এই ফ্ল্যাট কেনেন। এ ছাড়া অবসরের পর তিনি যেসব অর্থ পেয়েছেন, তাও স্ত্রীর কাছে গচ্ছিত ছিল। নেশাগ্রস্ত দ্বিতীয় ছেলে তৌফিক প্রায়ই টাকা চেয়ে বিরক্ত করতেন মাকে। বড় দুই ছেলে সেভাবে লেখাপড়া না করায় এবং দ্বিতীয় ছেলের নেশা করা নিয়ে প্রায়ই তিনি হতাশায় ভুগতেন। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তৃতীয় ছেলে শাওন এবং সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশুসন্তান তাহসানকে নিয়েও তিনি দুশ্চিন্তায় থাকতেন। এসব নানা ঘটনা থেকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকেন। প্রায়ই কাউকে না বলে বাসার বাইরে চলে যেতেন। কয়েক দিন আগে ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাসায় না ফেরায় তার ভাইয়ের বাসায় পরিবারের লোকজন গিয়ে খোঁজ করে জানতে পারেন, তিনি সেখানে যাননি। চার দিন পর শাহবাগ এলাকায় তাকে খুঁজে পায় পুলিশ। স্বামী হারুন নকিব শাহবাগ থানায় স্ত্রীকে দেখেশুনে রাখার মুচলেকা দিয়ে বাসায় নিয়ে আসেন। গতকাল মঙ্গলবার হাছিনা নকিবকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এ খবর জানতে পেরে সোমবার তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাকে বাসায় রেখে ফ্ল্যাট থেকে বেরোনোর প্রধান দরজা তালা দিয়ে রাখা হয়। রাতে তিনি রান্নাঘর সংলগ্ন ছোট বারান্দার গ্রিলের কাটা অংশ দিয়ে শাড়ি বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। ময়লা ফেলানোর সুবিধার্থে ওই গ্রিলটি কেটে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাড়ির লোকজন।
পুলিশের ধারণা, শাড়ি বেয়ে নামার সময় তাল রাখতে না পেরে তিনি নিচে পড়ে যান। তার মাথায় আঘাত লেগেছিল।
ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ওই নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। চারতলা থেকে শাড়ি ঝোলানো দেখে ধারণা করা যাচ্ছে, তিনি শাড়ি ধরে নিচে নামার চেষ্টা করেছিলেন। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে বলেও তিনি জানান। এডিসি ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এর আগে তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে চার দিন নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
এদিকে চকবাজারে নিহত নুরুন্নাহারের ভাগিনা মিজানুর রহমান জানান, ঢাকেশ্বরী রোডের ২২-৩, ক/২ নম্বর বাসার ৩য় তলায় থাকেন নুরুন্নাহার । তার স্বামী মৃত রুহুল আমীন শেখ সাবেক বিসিক পরিচালক। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পানির মোটর চালু করার জন্য তিনি বাসার নিচে নামেন। পানির ট্যাংকির ঢাকনা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার সময় অসাবধানতাবশত তিনি ভিতরে পড়ে যান। কিছুক্ষণ পর তার ভাই সেলিমসহ স্বজনরা তাকে খুঁজতে নিচে আসলে পানির ট্যাংকির ভিতর ভাসতে দেখেন। পরে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (এসআই) বাচ্চু মিয়া জানান, ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি চকবাজার থানা পুলিশ তদন্ত করে দেখছে।
অন্যদিকে সাভার থানার এসআই দীপঙ্কর বলেন, সোমবার গভীর রাতে বারান্দা দিয়ে হলের এক রুম থেকে অন্য রুমে যাওয়ার সময় ছয়তলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় সাইফুল্লাহ। পরে তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত সাইফুল্লাহ তালুকদার মহসিনের পিতার নাম আলী আকবর তালকুদার। তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার চেঙ্গুয়া গ্রামে। সে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির বিবিএ তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র ছিলো। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানান এসআই দীপঙ্কর।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ার হাবিব কাজল বলেন, দুটি ভবনের মাঝে কয়েক ফুটের ব্যবধান রয়েছে। সেখান থেকে অসর্তকভাবে পারাপারের সময় পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
#####

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *