মৃত ঘোষিত : কবরস্থানে নড়ে উঠলো নবজাতক

স্টাফ রিপোর্টার

নবজাতক শিশুটি ছিল জীবিত। যেহেতু চিকিৎসক বলেছেন মৃত, সেহেতু আর কী করার? নিয়ে যাওয়া হলো আজিমপুর কবরস্থানে। সেখানে যথারীতি দাফনের জন্য টাকা-পয়সা জমাসহ যা যা লাগে সবই করা হয়েছে। অবশেষে শিশুটিকে গোসলের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হলো। যেই এক মগ পানি শরীরে ঢালা হলো, অমনি শিশুটি হাত-পা নাড়তে শুরু করলো। শিশুটির বাবা মিনহাজ উদ্দিন খবরটি শুনে ছুটে নবজাতক সন্তানটিকে নিয়ে যান আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালে। সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে। শিশুটিকে বর্তমানে নিউনেটাল ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটে রাখা (এনআইসিইউ) হয়েছে। আর শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে খোদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সহকারী পরিচালক ডা. বিদ্যুৎ কান্তি পালকে প্রধান করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

জানা গেছে, গত শনিবার রাত একটার দিকে ধামরাইয়ের শ্রীরামপুর গ্রাম থেকে প্রবস ব্যাথা নিয়ে শারমিন আক্তার নামে এক গৃহবধূ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বেডে ভর্তি হন। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে নরমালভাবে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু চিকিৎসকরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত ঘোষনার পর শিশুটির বাবা মিনহাজ উদ্দিন এবং মামা শরীফ শিশুটিকে দাফনের জন্য আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে যান।

সোমবার সকাল প্রায় দশটা। শিশুটির মামা শরীফ মৃত শিশুটিকে দাফন করতে আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানে নিয়ে গেলে কবরস্থানের মোহরার হাফিজুল ইসলাম শিশুটিকে গোসল করাতে গোসলখানায় পাঠান। এ সময় তিনি বাহক শরিফের কাছ থেকে অভিভাবকের নাম-ঠিকানা লিখেন। তাদের কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে ঠিক তখনই গোসলখানায় জেসমিন আক্তার ঝর্ণা নামে এক নারী শিশুটির গায়ে পানি ঢালতেই শিশুটি মৃদু নড়েচড়ে ওঠে। চোখে ভুল দেখছেন ভেবে আবার পানি ঢালতেই দেখেন শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠানামা করছে। তখন তিনি অফিসে দৌড়ে গিয়ে খবর দিলে শিশুটির বাবা, মামা, মোহরারসহ উপস্থিত সকলে ছুটে যান। সবাই লক্ষ্য করেন নবজাতক শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে।

হাফিজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেটে নবজাতক মৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে নবজাতকের পিতার নাম- মিনহাজ। ঠিকানা- ধামরাই, ঢাকা লেখা হয়েছে। অজিমপুর কবরস্থান থেকে দ্রুত শিশুটিকে আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ সাংবাদিকদের জানান, শিশুটিকে হাসপাতালের এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে। আগের চেয়ে অবস্থার উন্নতি হলেও তার হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। তিনি বলেন, শিশুটিকে বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা যে খুব একটা ভালো তা বলা যাবে না। তবে তাকে যে অবস্থায় ঢাকা শিশু হাসপাতাল আনা হয়েছিল তার চেয়ে ভালো আছে।

অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ বলেন, শিশুটির হার্টবিট খুবই কম, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছে না। সাত মাসে ভূমিষ্ঠ হওয়ায় তার ওজনও কম, মাত্র এক কেজি। শরীরে রক্ত শূন্যতা আছে। নাভি দিয়ে রক্ত বের হয়েছে, এখানে নিয়ে আসার পর তা বন্ধ করা হয়েছে। একটু সুস্থ হলে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়ার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কীভাবে মৃত ঘোষণা করা হলো? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যতটা জেনেছি, রোববার রাতে গর্ভাবস্থায় কোনো নাড়াচাড়া না পেয়ে তখনই মৃত ধরে নেয়া হয়। পরে গতকাল সোমবার সকালে নরমালি ডেলিভারি করানো হয়। ডেলিভারির পর নবজাতক সাধারণত ৩ মিনিটের মধ্যে কেঁদে ওঠে এবং ১৫ মিনিটের মধ্যে না কাঁদলে সে আর সার্ভাইব করে না। এ নবজাতকের ক্ষেত্রে কী হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের প্রধান উদ্দেশ শিশুকে বাঁচানো।

গতকাল সোমবার ঢামেক হাসপাতালের ১০৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বেডে গিয়ে কথা হয় শিশুটির মা শারমিন আক্তারের সঙ্গে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি বলেন, এই হাসপাতালে আসার আগে এলাকার মালেকা হাসপাতালে ২দিন ভর্তি ছিলাম। সেখানে আল্ট্রাসোনোগ্রামসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা আমাদের বলেন, বাচ্চা ভালো আছে। সে সময় আমার বুক ও পেটের ভাঝ বরাবর একটু ব্যথা করতে থাকে। তবে এটি বাচ্চার জন্য কোনো ব্যথা নয় বলে অনেকেই আমাদের জনান। এজন্য ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হই। আমি পেটের মধ্যে বাচ্চার নড়াচড়া অনুভব করি। কেনো আমার বাচ্চা মারা গেলো তা জানি না। শিশুটি এখনও বেঁচে আছে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, আমি এখনও জানি না আমার বাচ্চার কি অবস্থা।

হাসপাতালের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শারমিনের মা সামিয়া বেগম জানান, গত শনিবার রাতে এখানে ভর্তি হই। গতরাতে শারমিনের প্রসব বেদনা হয়। এরপর আজ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই তার একটি মেয়ে বাচ্চা হয়। তবে চিকিৎসকরা আমাদের জানান, তার মৃত বাচ্চা হয়েছে। তবে আমরা কেউই বাচ্চাটিকে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখিনি।

হাসপাতালের নথিপত্র ও মৃত্যুর সনদপত্র দেখে জানা যায়, গত শনিবার রাত একটায় ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি হয় শারমিন। সকাল ৮টায় তার একটি মৃত মেয়ে বাচ্চা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক স্বাক্ষরসহ একটি মৃত্যু সনদপত্র দেন তার স্বজনদের।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, শারমিন আক্তার নামে এক প্রসূতি রোগীর ২৭  সপ্তাহ গর্ভবতী ছিলেন। নবজাতক শিশুটি আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শারমিন আক্তারের কিনা তা আমরা খতিয়ে দেখছি। প্রয়োজনে শিশুটির ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এ বিষয়ে ৪ সদস্যবিশিষ্ট  একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে তদন্ত করে দেখছেন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *